প্রকৃতি হচ্ছে জ্ঞানের ভান্ডার। আর সে জ্ঞান আহরণ করতে হলে বিশেষ একটা দৃষ্টির প্রয়োজন যে দৃষ্টিকে বলা হয় অন্তর দৃষ্টি। এই অন্তর দৃষ্টি তারই থাকে যার মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্ত্বা রয়েছে। এটা ঐশ্বরিক দান। সবাই এই সত্ত্বার অধকারী হয় না। আধ্যাত্মিক সত্ত্বা, এ শব্দাটা সম্ভত আদিকাল থেকেই প্রচলিত আছে যার গোড়াপত্তন হয়েছিল সৃষ্টির ঊষার লগ্ন থেকে। আধ্যাত্মিক সত্ত্বা বলতে একটা বিশেষ অস্থিত্বকে বুঝানো হয়েছে। যার কোন দৃশ্যমান আকৃতি নেই। এটা সম্পূর্ণ ভাবগত বিষয়। ভাবগত বিষয় হলেও এ সত্ত্বার আধিকারী ব্যাক্তিদের চেনা সম্ভব। একমাত্র তারাই চিনতে পারে যাদের মধ্যে এমনি আর একটি সত্ত্বা বিরাজমান থাকে। র্পূবেই বলেছি প্রকৃতি হচ্ছে জ্ঞানের ভান্ডার। যে ভান্ডারে জমা আছে সৃষ্টি ও ধংসের ইতিহাস। এ ইতিহাস কি সেটা একমাত্র আধ্যাত্মিক সত্ত্বার ব্যাক্তিরাই জানেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে আধ্যাত্মিক সত্ত্বা কি? অনেকেই হয় তো শুনে থাকবেন যে, সাপের মাথায় একটা মূল্যবান পর্দাথ পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় সর্পমনি। অনেকেই এটাকে বিশ্বাস করতে চায় না। এই কারণে যে এটা অত্যন্ত দুর্লভ বস্তু। ব্যাঙের মুখের মধ্যেও একটা লালা পাওয়া যায়। রাতে এ পর্দাথটা কোথাও রাখা হলে পদার্থটা জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকে। কোন কোন অঞ্চলে এটাকে মানিক বলে। এ সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা নাই। এবং অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। এরকম আরও অনেক ঘটনা আছে যেমন, ঝিনুকে মু্ক্তা পাওয়া যায়। হরিণের পেঠে সুগন্ধি কস্তরী পাওয়া যায়। যে সকল প্রাণী এসবের অধিকারী তাদের সংখ্যা খুব নগণ্য। এক লক্ষ প্রাণী মধ্যে একটিও পাওয়া যায় না বলেই চলে। তবে এই সকল পর্দাথ জড়-জগতে বিদ্যমান। এটা অস্বীকার করার উপায় নাই। মানুষের মধ্যেও ঠিক এমনি একটা সত্ত্বা রেয়েছে, যেটাকে আধ্যাত্মিক সত্ত্বা বলা হয়। যারা এই সত্ত্বার অধিকারী তাদের মধ্যে বিশ্বাসময় সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে জ্ঞানানুরাজ দেখা যায়। র্সূযটা প্রতিদিন র্পূব দিকে উদিত হয়ে পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। এরই মধ্যে জানার এবং বুঝার মত অনেক জ্ঞান আছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন মাথা ব্যাথা নেই। যাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্ত্বা আছে, এ ভাবনা তাদের। মুরগি ডিম পাড়ার সময় যেমন প্রসব-বেদনা অনুভব করে, ঠিক তেমনি আধ্যাত্মিক ব্যাক্তিগণ জ্ঞান আহরণের জন্য সে রকম বেদনা অনুভব করে। আর সেই জন্যই ছুটে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে। ইচ্ছে করলেই তারা চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। বেদনা লাগব করার জন্যই তারা ছুটে বেড়ায় অজানার রহস্যের পথে। তাদের মনে একমাত্র আনন্দ যদি সৃষ্টির কোন রহস্যের মধ্যে ডুব দিতে পারে। তাই তারা ভাবেন আর কাতর হয়ে থাকেন। একটা কথা এখানে উল্লেখযোগ্য যে, মানুষ সেচ্ছায় যা করেন তা তার একার তৃপ্তির জন্যই করেন। কেউ গান গায়, কেউ কবিতা পড়েন, কেউ আবার নাচনও করেন। যদি কোন কাজে আনন্দ বা তৃপ্তি না থাকে তবে কাজ খুবই কষ্টদায়ক হয়। এমনকি মানুষ কান্দে, ঝগড়া করেও এক ধরণের আনন্দ বা আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। যে যা করে তা দ্বারা সে এক ধরণের সুখ অনুভব করে। আধ্যাত্মিক ব্যাক্তিদের বেলায়ও তাই। যার মূল উৎস আধ্যাত্মিক সত্ত্বা। এই আধ্যাত্মিক সত্ত্বা এক দিনে বা এক মাসে বা এক বছরে তৈরী হয় না। এটা তৈরীর জন্য যে জিনিসটার প্রয়োজন তা হল মানুষিক প্রস্তুতি ও কর্মক্ষমতার প্রয়োজন। তারপর মহান সৃষ্টির্কতার অপার দয়া ও কৃপা। কারণ সৃষ্টির্কতার দয়া ও কৃপা না হলে কেহই আধ্যাত্মিক সত্ত্বার অধিকারী হতে পারবে না। সাধারণ মানুষের জ্ঞান আর আধ্যাত্মিক এক নয়। সব সাপের যেমন মনি হয় না, সকল ঝিনুকে যেমন মুক্তা হয় না ঠিক তেমনি সকল মানুষ আধ্যাত্মিক সত্ত্বার জ্ঞান লাভ করে না। যারা এই জ্ঞান লাভ করেন তারা অসাধারণ এবং তারা সকলের চেয়ে আলাদা। তারা সম্মানের অধকারী হয় কিন্ত ধনদৌলতের অধিকারী হন না। সাপ ও ঝিনুকের বেলায় যাদের মনি ও মুক্তা থাকে তাদের খাবার যোগার করার সময় ও ক্ষমতা নাই বিধায় অন্যন্য সাপ ও ঝিনুকরা তাদের খাবার যোগার করে দেয়। ঠিক তেমনি আধ্যাত্মিক সত্ত্বার ব্যাক্তিগণ র্সবক্ষণ ভাব-গভীরে নির্মজিত থাকে বিধায় তারাও খাবারের সন্ধানে বাহির হয় না। তাই তাদের খাবার যোগার করে দেয় সাধারণ মানুষ। এমন কি আধ্যাত্মিক ব্যাক্তিগণ র্দীঘদিন সকল প্রকার আহার থেকেও বিরত থাকে। এমনও নজির আছে ৪০ দিন কোন প্রকার খাবার না খেয়েও থাকতে পারেন। তাদের একমাত্র ভাবনা জড় বা বস্তু জগতে বিচরণ করে তা থেকে জ্ঞান আহরণ করে, সেই জ্ঞান দ্বারা মানুষের কল্যান ও সেবাদান করা। সেই সাথে তারা আধ্যাত্মিক সত্ত্বাকে প্রসারিত করে। ইহ জগতে তারা সকল প্রকার হিংসা, লোভ লালসা, ক্ষমাতার ঊর্দ্ধে থেকে জীবন অতিবাহিত করেন। এমন কি তারা নিজের দৈনিক চাহিদার জন্য যে সকল মৌলিক উপাদান যেমন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, ইত্যাদি পর্যন্ত তারা অহরণ করতে অসমর্থন হন। তারা হয়ে থাকেন পুত-প্রবিত্র চরিত্রের অধিকারী। তারা জানেন জড়-জগতে তারা মানুষকে দিতে এসেছেন, কোন কিছু নিবার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তা পাঠান নাই। তারা জানেন চাওয়া-পাওয়া লেনদেনের মধ্যে হিংসা, লোভ, ক্রোধের কামনা-বাসনার জন্ম হয়। তাই তারা কোন কিছু চাওয়ার নাই, শুধু পেতে চায় জ্ঞান। এই জ্ঞান দিয়ে তারা জড়-জগতের দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা, জেল, জুলুম, নির্যাতন এমনি কি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা শক্তি সঞ্চয় করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। তাদের পথ হয় ভঙ্গুর। তবে যে পথে একবার চলে সে পথ আর ভঙ্গুর থাকে না। সে পথ হয় সুন্দর ও মৃসণ কারুকার্যময়। এই সহজ পথেই তারা মানুষকে চলতে বলে। তাদের কাজ দুর্সাধ্যকে সাধ্য করে সাধারণের মাঝে বিলিয়ে দেয়া। এবং সাধারণ মানুষের কাছে যাহা কঠিন বলে মনে হয় তা সহজভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করা। সৃষ্টির রহস্য জানা সবার দ্বারা সম্ভব নয়। একমাত্র আধ্যাত্মিক সত্ত্বার ব্যক্তিগণই এ ক্ষমতার আধিকারী হন। তারা তাদের অন্তর চক্ষুর দ্বারা সকল সৃষ্টির মূল বেদ দর্শন করতে পরেন। মোদ্দা কথা সব জ্ঞান সবার জন্য নয়। সব মানুষ সমান ক্ষমতার অধিকারী নয়। তবে যার মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্ত্বা আছে তার মধ্যে থেকে বিস্ময়-সংশয় জ্ঞানানুরাগ সৃষ্টি হতে থাকে। যেমন পাতা থেকে গাছের জন্ম হয় না, তবে পাতার সাথে গাছের সম্পর্ক আছে। তেমনি আধ্যাত্মিকতার সাথে বিস্ময় ও সংশয়ের নিবির সম্পর্ক। সাধারণ মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্ত্বা নেই বলে তারা দার্শনিক হতে পারে না। এবং তারা সৃষ্টির রহস্য নিয়ে তাদের মধ্যে কোন কৌতুহল নাই। এ নিয়ে তারা মাথাও ঘামায় না। এটা আমরা সাধারণভাবে বুঝতে পারি। কোন ব্যাক্তি যদি ভাবে এবং আধ্যাত্মিকতা নিয়ে লিখালিখি করে তবে বুঝতে হবে তার মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্ত্বা আছে। আর এই শক্তির মূল উৎস হচ্ছে পরম সত্ত্বা।
পরিশেষে আমি বলব, এই সকল আধ্যাত্মিক ব্যাক্তিদের সম্মান জানাতে। কারণ তারা আল্লাহর নেয়ামত প্রাপ্ত ব্যাক্তি। তারা মানব জাতির দ্বিতীয় সারির ব্যাক্তি। আশা করি সবাই এ কাজটি করবেন।
[লেখক,সাধক ও ভজনগুরু : স স আলম শা্ (আলম সাধু)]

ধন্যবাদ
ধন্যবাদ আপনাদেরকে আমার লেখা প্রকাশের জন্য