আবাসন একাধারে জীবিকা ও উন্নয়নের বিষয়। চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, ‘পুরনো আবাসিক এলাকাগুলোর সংস্কার জনগণের প্রাপ্তি, সুখ ও নিরাপত্তার অনুভূতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং এটি জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘পুরনো শহরাঞ্চলগুলোর সংস্কারে বিভিন্ন ইচ্ছা ও চাহিদার প্রতি সাড়া দেওয়া উচিত এবং এ কাজ অনেক বড়। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর উচিত, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ও সতর্কতার সাথে কাজটি আঞ্জাম দেওয়া।’
মে মাসেও ইনার মঙ্গোলিয়ার হিঙ্গান লীগের আরশান শহরে হিমেল হাওয়া বয়ে চলে। বৃহত্তর সিংআন পর্বতমালার দক্ষিণ পাদদেশে অবস্থিত এই ছোট্ট শহরটিতে, গ্রীষ্মকাল সবসময় দেরিতে আসে।
‘কাঠ-কাদা’ বলতে আরশানের বনকর্মীদের কাঠের তক্তা ও কাদার গাঁথুনি দিয়ে তৈরি দেয়ালকে বোঝায়। স্থানীয় বাসিন্দা চৌ ছাং হে এবং তার পাঁচ জনের পরিবার, কয়েক দশক ধরে, ২০ বর্গমিটারের কিছু বেশি আয়তনের একটি ঘিঞ্জি ‘কাঠ-কাদা’-র বাড়িতে বাস করতেন। তিনি বলেন, ‘তখন এই প্রশস্ত ও উষ্ণ অ্যাপার্টমেন্টের স্বপ্ন দেখার সাহসইবা কার ছিল!?’
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে, আরশান শহর পরিদর্শন করেন। তিনি দরিদ্র বনকর্মীদের বাড়ির ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলো পরিদর্শন করেন, উত্তপ্ত দেওয়াল স্পর্শ করেন, নববর্ষের উপহারসামগ্রী দেখেন। তিনি স্থানীয় কর্মকর্তাদের বস্তিগুলোর সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করতে, একটি সময়সূচি তৈরি করতে, এবং বাসিন্দারা যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নতুন বাড়িতে যেতে পারে—তা নিশ্চিত করতে তাগিদ দেন।
এরপর আরশান শহর একটি বড় আকারের বস্তি সংস্কার প্রকল্প চালু করে, যেখানে মোট প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ৬.৬ লাখ বর্গমিটারের আবাসন ভেঙে ফেলা হয় এবং ১০.৪ হাজারটি বস্তির ঘরবাড়ি সংস্কার করা হয়। আরশান সিটি আবাসন ও নগর-গ্রামীণ উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক ওয়াং সিয়াও লং বলেন, বর্তমানে বস্তির সকল বাসিন্দা বস্তি ছেড়ে অ্যাপার্টমেন্টে চলে গেছেন। এই বস্তি সংস্কারের ফলে আরশান শহরের অর্ধেকেরও বেশি বাসিন্দা উপকৃত হয়েছেন।
২০১৭ সালে চৌ ছাং হে মাটির ইটের বাড়ি থেকে ৬০ বর্গমিটারের একটি নতুন অ্যাপার্টমেন্টে হস্তান্তরিত হন।
লিয়াওনিং প্রদেশের শেনইয়াং শহরের তাতং এলাকার চাং’আন আবাসিক এলাকায় একটি সুউচ্চ পুরোনো চিমনি দাঁড়িয়ে আছে। এটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত একটি বয়লার ঘর ছিল, যা পুরোনো আবাসিক এলাকাটির সংস্কারের সময় চাং’আন গণসেবা কেন্দ্র ও অন্যান্য আবাসিক কার্যকলাপের স্থানে রূপান্তরিত হয়। এখানে বিশেষ ক্লাসে অংশ নেওয়া শিশুরা, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বয়স্করা, এবং সুবিধাজনক পরিষেবা গ্রহণকারী বাসিন্দারা অবিরাম আসা-যাওয়া করেন।
আবাসিক এলাকার চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কমিটির সম্পাদক ছাও স্যুয়ে বলেন, ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং চাং’আন আবাসিক এলাকা পরিদর্শনকালে উল্লেখ করেন যে, নগর সংস্কার স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এলাকার উন্নয়নের সাথে সমন্বিত হওয়া উচিত। সবকিছু যেন জনগণের জন্য সুবিধাজনক, উপকারী ও নিরাপদ হয়, সেদিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের যত্ন নিতে হবে।
প্রতি সপ্তাহান্তে এলাকাটির বাসিন্দা ওয়াং কুই মিন তার নাতিকে নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে গণসেবাকেন্দ্রে আসেন। এখানকার শিশুদের পড়ার জায়গায় ৫০০০-এরও বেশি শিশুতোষ বই রয়েছে এবং এখানে প্রায়শই অভিভাবক-সন্তান পাঠ পর্ব ও গল্প বলার আসরের মতো কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও, ‘সুখ শিক্ষা শ্রেণীকক্ষ’-এ রোবট প্রোগ্রামিং, ক্যালিগ্রাফি, এবং ফ্লোর কার্লিং-এর মতো শিশুদের আগ্রহের ২০ ধরনের কোর্স করানো হয়।
ছাও স্যুয়ে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কয়লা, পানি, বিদ্যুৎ এবং তাপের মতো অবকাঠামোগত সুবিধাগুলোর সংস্কার একের পর এক সম্পন্ন হয়েছে এবং জীবনযাত্রার পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ হলো, সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশনা অনুসরণ করে, বয়স্ক-বান্ধব সংস্কার ও শিশু-বান্ধব স্থান নির্মাণ করা এবং বাসিন্দাদের সুখ বৃদ্ধি করা।
২০২৪ সালে সি চিন পিং ছংছিং শহরের জিউলংফো এলাকার মিনেচু গ্রাম পরিদর্শন করেন। তখন তিনি বলেন, পুরোনো আবাসিক এলাকাগুলোর সংস্কার নগর নবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং এটি এমন একটি প্রকল্প, যা জনগণের উপকারে আসে। ঐতিহাসিক স্মৃতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো সংরক্ষণ করা অপরিহার্য।
গ্রামটির সম্পাদক ও পাড়া কমিটির পরিচালক উ ছেং লি বলেন, সংস্কার ও আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া চলাকালে, গ্রামটি বাসিন্দাদের চাহিদার প্রতি সাড়া দিয়েছিল এবং নাপিত ও জুতা মেরামতকারীর মতো ঐতিহ্যবাহী কারিগরদের জন্য বিশেষভাবে স্থান সংরক্ষিত রেখেছিল।
৭৭ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা ছেন তাই রং বলেন, যদিও পুরোনো রাস্তা ও গলিগুলো সংস্কার করা হয়েছে, তবুও রেখে যাওয়া সুন্দর স্মৃতিগুলো ম্লান হয়ে যায়নি এবং পুরোনো প্রতিবেশীদের মধ্যকার বন্ধুত্বও কমেনি।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে চীন বিভিন্ন ধরণের ৬৮ মিলিয়নেরও বেশি সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন এবং বস্তি সংস্কার আবাসন নির্মাণ করেছে, যা আবাসন সমস্যায় জর্জরিত ১৭০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের একটি নিরাপদ ও আরামদায়ক বাড়ির স্বপ্ন পূরণ করেছে; ৩০ লাখেরও বেশি পুরোনো আবাসিক এলাকা সংস্কার হয়েছে, যা ১৩০ মিলিয়নেরও বেশি নগরবাসীর উপকার করেছে।
সূত্র:ছাই-আলিম-ওয়াং হাইমান,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।
