এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ স্তরের, সর্বব্যাপী এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক সহযোগিতা ব্যবস্থা। এপেক-এর “চীন বছর”-এর বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের প্রতীকী অনুষ্ঠান হিসেবে, “উন্মুক্ততা, পারস্পরিক সংযোগ ও সমন্বয়: এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংযুক্তি ও ভবিষ্যৎ সৃষ্টি” শীর্ষক এপেক বাণিজ্যিক নেতৃবৃন্দের চীনা সম্মেলন, ২১ জুন বেইজিংয়ে আয়োজিত হয়। এতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, পারস্পরিক সংযোগ, ডিজিটাল উদ্ভাবন—এসব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বিষয়গুলোর ওপর, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক নেতারা, গভীর মতবিনিময় ও ঐক্যমত গঠন করেন এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও বৈশ্বিক উন্নয়নের নতুন অধ্যায় রচনার জন্য হাতে হাত মেলান।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জনসংখ্যা বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ; অর্থনীতি বিশ্বের ৬০%-এর বেশি; এবং বাণিজ্য প্রায় অর্ধেক। বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা আছে; টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তিও দুর্বল। এই প্রেক্ষাপটে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উন্নয়য়নের মান বিশেষ নজর কাড়ে।
“এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক মহল হলো যুগের অগ্রদূত, পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক এবং প্রবাহের নেতৃত্বদানকারী। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যতই অস্থির ও জটিল হোক না কেন, আমাদের উচিত একে অপরের দিকে এগিয়ে আসা, সংকট কাটিয়ে উঠতে হাতে হাত মেলানো, সহযোগিতা গভীর করা এবং পারস্পরিক লাভ নিশ্চিত করা।” চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রচার পরিষদের সভাপতি রেন হংপিন বলেন, এপেকের সদস্যদেশগুলোর উচিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা, বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা; একতরফাবাদ ও সংরক্ষণবাদের বিরোধিতা করা; বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উদারীকরণ ও সহজীকরণ অব্যাহত রাখা; এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও পারস্পরিক সংযোগ নেটওয়ার্ক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীভবনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ২০২৬ সাল এপেক নেতৃবৃন্দের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের স্বপ্ন ঘোষণার ২০তম বার্ষিকী। এপেক আন্তর্জাতিক সচিবালয়ের নির্বাহী পরিচালক এডুয়ার্ডো পেদ্রোসা বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক মহলের উচিত, সহযোগিতার মূল কথায় অটল থাকা, উন্মুক্ততার ঐক্যমত জোরদার করা, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীভবনের প্রক্রিয়া সুসংহতভাবে এগিয়ে নেওয়া এবং এপেককে শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে সহায়তা করা, যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে ওঠে।
এপেক বাণিজ্যিক উপদেষ্টা পরিষদের মার্কিন প্রতিনিধি ও বোয়িং চীনের সভাপতি লেন্ডন লুমিস বলেন, বিমান শিল্প পারস্পরিক সংযোগের জাল আরও ঘন করার গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বর্তমানে প্রতিদিন বিশ্বে প্রায় ১৪ হাজার বোয়িং বিমান চলাচল করে; প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ১০ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। আগামী ২০ বছরে আনুমানিক ৬০% বিমান এপেক অঞ্চলে সরবরাহ করা হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সংযোগের মান বাড়ালে, অর্থনৈতিক বাণিজ্য সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়বে এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন আরও শক্তিশালী হবে।
উদ্ভাবন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক উড্ডয়নের ডানা এবং এপেকের বাণিজ্যিক সহযোগিতার নতুন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র। বর্তমানে, নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও শিল্প রূপান্তর দ্রুত এগোচ্ছে; বিশেষ করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে, যা বিশ্বের সম্পদ বণ্টন ও শিল্প বিকাশের ধরনকে ব্যাপকভাবে বদলে দিচ্ছে এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শিল্প-সহযোগিতায় অফুরন্ত ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করছে।
আলোকচিত্রের সরঞ্জাম, সম্প্রচার যন্ত্রপাতি, ফ্যান জোনের প্রদর্শনী উপকরণ—চলমান যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপের ১৬টি বৈশ্বিক পৃষ্ঠপোষকের মধ্যে চীনা সংস্থা রয়েছে চারটি। আর আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্রের জাতীয় ফুটবল দলের সরকারি অংশীদার হিসেবে, টিসিএল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে চীনা ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক প্রভাব আবারও প্রমাণ করছে।
“গত এক দশকেরও বেশি সময়ে চীনা উত্পাদন শিল্প স্মার্ট উত্পাদন, শিল্প ইন্টারনেট, ডিজিটাল সরবরাহ শৃঙ্খল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ—এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক অনুশীলন করেছে এবং সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।” টিসিএলের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান লি তুংশেং বলেন, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এখনও উন্নয়নের পার্থক্য ও ডিজিটাল বিভাজন বিদ্যমান; তাই, চীনের অগ্রণী উত্পাদন সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও সক্ষমতা রয়েছে—অভিজ্ঞতা বিনিময়, সক্ষমতা নির্মাণ এবং বাস্তুতান্ত্রিক সমন্বয়ের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের সামগ্রিক আপগ্রেডেশন ঘটানো, অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া অর্থনীতিগুলোকে শক্তিশালী করা এবং আঞ্চলিক সম্মিলিত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।
শিল্প উৎপাদন, আর্থিক সেবা, জ্বালানি রূপান্তর—এসব ক্ষেত্রে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ দেখে, “টেকসই বাজার উদ্যোগ”-এর প্রধান নির্বাহী সেফি বলেন, প্রয়োগের পর্দা উন্মোচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও বেশি ক্ষেত্র ও মানুষের জীবনকে “আলোকিত” করবে। এই প্রেক্ষাপটে এপেকের সদস্যদেশগুলোর উচিত ডিজিটাল বিভাজন দূর করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ডিজিটাল উদ্ভাবন প্রযুক্তির গুণক প্রভাব পুরোপুরি কাজে লাগানো, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে নতুন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করা, এবং আরও স্থিতিস্থাপক ও সজীব এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ডিজিটাল অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলা।
সূত্র:স্বর্ণা-আলিম-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।
