ঐতিহাসিক নথিতে উন্মোচিত জাপানি সেনাবাহিনীর রাসায়নিক যুদ্ধ কর্মসূচির অজানা অধ্যায়

চীন-জাপান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ৮৯তম বার্ষিকী উপলক্ষে, ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৭৩১ ইউনিটের অপরাধ প্রমাণ প্রদর্শনী হল “কোয়ানতুং আর্মি কেমিক্যাল ডিপার্টমেন্টের আত্মসমর্পণের বিবৃতি” (সংক্ষেপে “আত্মসমর্পণের বিবৃতি”) জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করেছে। কোয়ানতুং আর্মি কেমিক্যাল ডিপার্টমেন্ট ১৯৩৯ সালে হেইলংচিয়াং প্রদেশের ছিচিহার শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা “ম্যানচুরিয়ান ৫১৬ ইউনিট” নামেও পরিচিত। এটি মূলত ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর রাসায়নিক অস্ত্রের গবেষণা ও প্রয়োগের দায়িত্বে ছিল এবং জাপানের রাসায়নিক যুদ্ধের মূল ইউনিটগুলির মধ্যে একটি।

ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৭৩১ ইউনিটের অপরাধ প্রমাণ প্রদর্শনী হলের প্রচার, শিক্ষা ও প্রদর্শনী বিভাগের পরিচালক চিন শিছেং জানিয়েছেন, ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৫১৬ ইউনিট ছিল চীনা যুদ্ধক্ষেত্রে জাপান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বিশেষ একটি রাসায়নিক যুদ্ধ ইউনিট। এর ইউনিট কমান্ডার কোয়ানতুং আর্মি কমান্ডারের অধীনে পরিচালিত হত এবং সরাসরি কোয়ানতুং আর্মিকে রাসায়নিক যুদ্ধের প্রস্তুতি ও উপাত্তের জরিপ, গবেষণা ও পরীক্ষা প্রদান করত।

প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে এতে ছয়টি শাখা ছিল, যথা: প্রশাসনিক শাখা, অস্ত্র শাখা, পরীক্ষামূলক শাখা, রোগতত্ত্ব শাখা, রোগতত্ত্ব ও প্রতিরক্ষা শাখা এবং আবহাওয়া শাখা। পরে এটি আটটি বিভাগ ও একটি কার্যালয়ে সম্প্রসারিত হয়। এতে পর্যায়ক্রমে ছয়জন ইউনিট কমান্ডার নিয়োজিত ছিলেন, যথা: প্রথম কমান্ডার কাটসুমুরা ফুজিরো, দ্বিতীয় কমান্ডার কোজনাগি মাসাও, তৃতীয় কমান্ডার মিয়ামোতো সিয়িচি, চতুর্থ কমান্ডার ইয়ামাওয়াকা মাসাও, পঞ্চম কমান্ডার আকিয়ামা কানামাসা এবং ষষ্ঠ কমান্ডার নিওয়া তোশিও। ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৫১৬ ইউনিট পর্যায়ক্রমে স্নায়ু-আক্রমণকারী, বিধ্বংসী, দমবন্ধকারী ও উত্তেজক বিষাক্ত এজেন্ট তৈরি করে। একই সময়ে, জাপানি সেনাবাহিনী উত্তর-পূর্ব চীনের বাইরের এলাকায় বারবার বিষাক্ত গ্যাস সিলিন্ডার নিক্ষেপ করে এবং বিষাক্ত এজেন্ট স্প্রে করে গ্যাসের প্রাণঘাতী ক্ষমতা পরীক্ষা করে।

চিন শিছেং সাংবাদিকদের জানান, ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৫১৬ ইউনিটের “আত্মসমর্পণের বিবৃতি”-তে একজন সদস্যের জীবনবৃত্তান্ত বিশেষভাবে মনোযোগের দাবি রাখে। এই ব্যক্তির নাম কাওয়ানামি মামোরু, যাকে ১৯৪৫ সালের ৭ জানুয়ারি ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৫১৬ ইউনিট হাইলার এলাকায় শীতকালীন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রেরণ করে। কাওয়ানামি মামোরু এই অভিযানে ঠিক কী পরীক্ষামূলক কাজ সম্পাদন করেছিলেন? যদিও “আত্মসমর্পণের বিবৃতি”-তে এটি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ নেই, তবে পূর্ববর্তী গবেষণার সাথে সংযুক্ত করে অনুমান করা যায় যে, এটি গ্যাস পরীক্ষার দিকেই ইঙ্গিত করে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রযুক্তিবিদ গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রণীত “জাপানের রাসায়নিক অস্ত্র প্রযুক্তির ইতিহাস” অনুসারে, জাপানি সেনাবাহিনী ১৯৩৩ সাল থেকে উত্তর-পূর্ব চীনে গ্যাস পরীক্ষা শুরু করে, যার মধ্যে হাইলার এলাকায় প্রধানত হাইড্রোসায়ানিক অ্যাসিডের পরীক্ষা চালানো হত। হাইড্রোসায়ানিক অ্যাসিড একটি তরল পদার্থ, যা প্রধানত বাষ্পীভবনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ দেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী বিষাক্ত এজেন্ট হিসেবে কাজ করে, কোষীয় শ্বসন দমন করে মানুষকে হত্যা করে। এটি শ্বাস নেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাথা ঘোরা, খিঁচুনি এবং তাত্ক্ষণিক অজ্ঞানতা সৃষ্টি করে, কয়েক মিনিটের মধ্যে চেতনা হারায় এবং মানবদেহের মৌলিক জীবন কার্যক্রম ধ্বংস করে।

হারবিন সমাজবিজ্ঞান একাডেমির ৭৩১ সমস্যা আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক কোং ওয়েনচিং সাংবাদিকদের একজন জাপানি আগ্রাসী যুদ্ধাপরাধী ও ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৫১৬ ইউনিটের সদস্য ওয়াতানাবে কুনিওশির জবানবন্দি প্রদর্শন করেন, যেখানে ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৫১৪ ইউনিটের হাইলার এলাকায় গ্যাস পরীক্ষার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

১৯৪০ সালের মে মাসে, ওয়াতানাবে কুনিওশি হাইলার এলাকায় নবাগত সৈন্যদের পরিচালনা করে প্রায় ৫০টি পরিবারের একটি গ্রাম ও তার নিকটবর্তী নদীতে বিধ্বংসী- প্রকার স্থায়ী বিষাক্ত গ্যাস নিক্ষেপ করেন। এই গ্যাসের মাত্র ১০০ কিলোগ্রাম ২০০০ বর্গমিটার এলাকা দূষিত করতে এবং ১০০০ জনকে হত্যা করতে সক্ষম ছিল এবং এর অবশিষ্টাংশ এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই পরীক্ষার ফলে ৬ জন চীনা পুরুষ নিহত হন এবং প্রায় ৫০ জন পুরুষ ও নারী হাতে-পায়ে মারাত্মক সংক্রমণ ও আঘাতপ্রাপ্ত হন। এটি ওয়াতানাবে কুনিওশি একাই অংশগ্রহণ করা সাতটি গ্যাস পরীক্ষার একটি মাত্র, এবং এটি ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর অস্ত্রের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য পরিচালিত বিপুল সংখ্যক জীবন্ত রাসায়নিক পরীক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র, যার পিছনে রয়েছে চীনা জনগণের ভয়াবহ প্রাণহানি।

চিন শিছেং জানান, ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৫১৬ ইউনিট হাইলারে গ্যাস পরীক্ষা চালিয়েছিল। প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে শীতল পরিবেশে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারিক কার্যকারিতা অধ্যয়নের জন্য। জাপানি সেনাবাহিনী বারবার হাইলারকে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল এখানে জনসংখ্যা কম, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সীমানাযুক্ত এবং জলবায়ু পরিস্থিতি সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধের বাস্তব পরিবেশ অনুকরণের জন্য উপযুক্ত। কাওয়ানামি মামোরুর জীবনবৃত্তান্ত এবং ওয়াতানাবে কুনিওশির জবানবন্দি পরস্পরকে নিশ্চিত করে, যা ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর ৫১৬ ইউনিটের হাইলারে গ্যাস পরীক্ষার অপরাধ আরও ভালোভাবে উন্মোচিত করে।

সূত্র:স্বর্ণা-তৌহিদ-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

Spread the love

Related posts

ছরের প্রথম পাঁচ মাসে প্রায় ২০ বিলিয়ন ইউয়ানের রোবট রপ্তানি করেছে চীন

চীন-মার্কিন যুব বিনিময়ে পান্ডা হলো বন্ধুত্বের দূত

দ্রুতগতির বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চীনের নতুন কার্গো রুট

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments