ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এগোচ্ছে নতুন সিচাং

চলতি বছর চীনের সিচাং তথা তিব্বতের শান্তিপূর্ণ মুক্তির ৭৫তম বার্ষিকী। আজকের ‘বিশ্বের ছাদ’ আর দূরবর্তী ও রহস্যময় ‘শাংগ্রিলা’ নয়; বরং চরম ভৌগোলিক পরিবেশেও আধুনিকায়ন সম্ভব-এমন বিশ্বাসের নতুন দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। আর চীনের সিচাং শাসনকৌশলই এই সাফল্যের ‘মূল চাবিকাঠি’। সম্প্রতি চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)-র সিজিটিএন কর্তৃক পরিচালিত এক বৈশ্বিক জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৪.৮ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সিচাংয়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি চীনা শৈলীর আধুনিকায়নের ফল। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের এই আধুনিকায়ন নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা এখনও তুষারাবৃত মালভূমিতে প্রাণবন্তভাবে এগিয়ে চলেছে।

এ বিষয়ে চীনা সমাজবিজ্ঞান একাডেমির অধ্যাপক ওয়াং চিয়ান ফেং তাঁর একটি প্রবন্ধে লিখেছেন: ১৯৫১ সালে সিচাংয়ের শান্তিপূর্ণ মুক্তির আগে সেখানে অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত দুর্বল; আধুনিক শিল্প বলতে প্রায় কিছুই ছিল না; অর্থনীতি মূলত ঐতিহ্যগত কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৫১ সালে সিচাংয়ের জিডিপি ছিল প্রায় ১২৯ মিলিয়ন ইউয়ান, আর ২০২৫ সালে তা পৌঁছেছে ৩০৩.১৮৯ বিলিয়ন ইউয়ানে—যা ১৯৫১ সালের তুলনায় ২৩৫০ গুণ বেশি। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে, সিচাংয়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতির আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। এক হাজার বিলিয়ন ইউয়ান জিডিপি অতিক্রম করতে যেখানে ৫০ বছর লেগেছিল, সেখানে দুই হাজার বিলিয়নে পৌঁছাতে সময় লেগেছে মাত্র ৬ বছর; আর তিন হাজার বিলিয়ন অতিক্রম করতে লেগেছে মাত্র ৪ বছর।

সিজিটিএনের জরিপে ৭৮.৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সিচাংয়ের অর্থনীতি দ্রুত উন্নতি করেছে। শান্তিপূর্ণ মুক্তির আগে সিচাংয়ের অধিকাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্য ও নিপীড়নের মধ্যে জীবনযাপন করত; আর সম্পদের বণ্টন ছিল অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। ১৯৫৯ সালের গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে, সিচাংয়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ প্রথমবারের মতো, চারণভূমি, গবাদিপশু ও কৃষিজমির মতো উত্পাদন উপকরণের মালিকানা লাভ করে। ২০২৫ সালে সিচাংয়ের গ্রামীণ বাসিন্দাদের মাথাপিছু ব্যবহারযোগ্য আয় দাঁড়ায় ২৩ হাজার ১৮৪ ইউয়ানে। মোট ৬ লাখ ২৮ হাজার দরিদ্র মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে, এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, সিচাংয়ে চরম দারিদ্র্য সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। সিজিটিএনের জরিপের ৮০.৬ শতাংশ উত্তরদাতা সিচাংয়ের দারিদ্র্যবিমোচন সাফল্যকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন।

‘বিশ্বের ছাদ’ এবং ‘এশিয়ার জলাধার’ হিসেবে পরিচিত ছিংহাই-সিচাং মালভূমির পরিবেশগত নিরাপত্তা সমগ্র মানবজাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। চীনা সরকার সিচাংয়ের পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং ২০২৩ সালে “চীনের ছিংহাই-সিচাং মালভূমি পরিবেশ সুরক্ষা আইন” প্রণয়ন করে। বর্তমানে তিব্বতে তৃণভূমির সার্বিক উদ্ভিদ আচ্ছাদনের হার ৪৮ শতাংশের বেশি, বনভূমির হার ১২ শতাংশের বেশি, মাটি ও পানি সংরক্ষণ হার ৯২ শতাংশের বেশি। প্রধান নদী, হ্রদ ও পানীয় জলের উত্সগুলোর পানির মান শতভাগ মানদণ্ড পূরণ করেছে। পরিষ্কার জ্বালানি থেকে উত্পাদিত বিদ্যুতের হার ৯৯ শতাংশেরও বেশি এবং অ-জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ৫৫ শতাংশের বেশি, যা দেশে সর্বোচ্চ। এ বিষয়ে ৮৩ শতাংশ উত্তরদাতা সিচাংয়ের পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাকে উচ্চভাবে মূল্যায়ন করেছেন।

শান্তিপূর্ণ মুক্তির আগে সিচাংয়ে নিরক্ষরতার হার ছিল ৯৫ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে সেখানে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ৯২.৮৩ শতাংশ, নয় বছরের বাধ্যতামূলক শিক্ষার ধারাবাহিকতার হার ৯৮.৭৪ শতাংশ, মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির হার ৯২.০৪ শতাংশ, এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার ৬০.০২ শতাংশে পৌঁছেছে। আত্মবিশ্বাসী, উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এক নতুন সিচাং আজ তার নিজস্ব আকর্ষণ নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে সংলাপে অংশ নিচ্ছে।

সিচাংয়ের আধুনিকায়নের সফল বাস্তবতা মূলত মানুষের গল্প – ৩৭ লাখেরও বেশি সিচাং বাসিন্দার উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষার গল্প। একই সঙ্গে এটি জনগণকেন্দ্রিক চীনা সিচাং শাসনকৌশলের এক সফল বাস্তব উদাহরণ।

সূত্র: শিশির-আলিম-আকাশ,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

Spread the love

Related posts

চীন-সার্বিয়া সম্পর্কের কৌশলগত গভীরতা ফুটে উঠল বেলগ্রেডের অনুষ্ঠানে

পুতিন-সি বৈঠকে আঞ্চলিক শান্তি ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব

স্মার্ট কাস্টমস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ এপেকের

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments