গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নে চীনকে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর বললেন ইউনেস্কো প্রধান

গত ১১ মে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর খালেদ আল-আনানি তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক চীন সফর শুরু করেন। চীনের সাথে ইউনেস্কোর ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের সহযোগিতা এবং বিশ্ব সভ্যতার পারস্পরিক বিনিময়ে চীনের অবদানকে তিনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন? চায়না মিডিয়া গ্রুপ সিএমজিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর মতামত তুলে ধরেন।

সাক্ষাৎকারে মহাপরিচালক জানান, তাঁর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো চীনের সাথে ইউনেস্কোর সুদৃঢ় অংশীদারত্বকে আরও গভীর করা। তাঁর মতে, চীন ইউনেস্কোর অন্যতম শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এখন কেবল দুই পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ‘গ্লোবাল সাউথ’ দেশগুলোর উন্নয়নেও বিস্তৃত হয়েছে। শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো ইউনেস্কোর প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে চীনের সাথে যৌথ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি ইউনেস্কোয় নিযুক্ত চীনা প্রতিনিধি দলের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখে আসছেন। এবারের সফরে চীনের হাংচৌ শহরে অনুষ্ঠিত ‘বিশ্ব ডিজিটাল শিক্ষা সম্মেলন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।

ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগকে বর্তমান যুগের অনিবার্য প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করে আল-আনানি বলেন, “প্রযুক্তিকে অবশ্যই মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ যেন অবশ্যই নৈতিক নীতিমালা মেনে চলে এবং তা সমাজে সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়।”
গত ১২ মে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ইউনেস্কোর মহাপরিচালককে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সভ্যতার সংলাপ এবং পারস্পরিক বিনিময়ের প্রতি চীনের দৃঢ় সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

আল-আনানি উল্লেখ করেন যে, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাথে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল “জনগণ”। উভয় পক্ষই বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিতে এবং বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একে অপরের কাছ থেকে শেখার পূর্বশর্ত হলো সংলাপ ও পারস্পরিক কথা শোনা, যা শেষ পর্যন্ত সমঝোতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করে—আর এটাই ইউনেস্কোর মূল চেতনা।

প্রেসিডেন্ট সি এবং আল-আনানির মধ্যে গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোকে সহায়তা করা, বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যকার দূরত্ব ঘোচানো এবং বহুপাক্ষিকতার নীতি বজায় রাখার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণসহ একাধিক ক্ষেত্রে চীনের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে দুই নেতা একমত হন।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, “আজকের বিশ্বের বিভেদমূলক পরিস্থিতি, সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত বৈষম্য আমাদের ৮০ বছর আগে ইউনেস্কো প্রতিষ্ঠার দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। আজ আমাদের একে অপরের কথা শোনার এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।”

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যখন ইউনেস্কো সদর দপ্তরে এক ঐতিহাসিক সফর করেছিলেন, তখনও তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সভ্যতার পারস্পরিক বিনিময়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন। এই ভাবনাটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগসহ একাধিক বৈশ্বিক উদ্যোগের সাথে গভীরভাবে মিলে যায়। তিনি মন্তব্য করেন, চীন এখন আর কেবল একটি সাধারণ রাষ্ট্রের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর ও শক্তির প্রতীক।

মহাপরিচালক তাঁর এই সফরে শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি মনে করেন, ডিজিটাল শিক্ষা এবং এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে, তা থেকে পুরো বিশ্বের শেখার রয়েছে। চীনের ‘জাতীয় স্মার্ট শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম’ ইতিমধ্যেই বিশ্বের কোটি কোটি কিশোর-তরুণকে শিক্ষার আলো ছড়াতে সাহায্য করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে, শিক্ষার পরিধি বাড়াবে এবং তরুণদের আরও ব্যক্তিগতকৃত উপায়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দেবে।

আন্তর্জাতিক:শুয়েই-তৌহিদ-জিনিয়া,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

Spread the love

Related posts

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের ভূমিকাকে স্বাগত চীনের

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদারে চীনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন এপেকে

চীন-সার্বিয়া সম্পর্কের কৌশলগত গভীরতা ফুটে উঠল বেলগ্রেডের অনুষ্ঠানে

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments